ঐতিহাসিকদের সর্বসম্মত কথা হল, আরব বণিকদের মাধ্যমেই এদেশে ইসলাম এসেছে। তবে ইসলাম প্রচারকদের আগমনের সুনির্দিষ্ট সময় নিয়ে বেশ কথা থাকলেও বিশুদ্ধ মত হল মহানবী (সা.) জীবিত থাকা অবস্থায়ই এদেশে ইসলামের দাওয়াত এসে পৌঁছায়। নবুওয়াতের সপ্তমবর্ষে (৬১৭ খৃস্টাব্দে) সাহাবী হজরত আবু ওয়াক্কাস মালিক বিন ওহাইবের (রা.) চীনে আগমনই এ কথার পক্ষে জোরালো প্রমাণ বহন করে। সাহাবী হজরত কাসেম ইবনে হুজাইফা (রা.), উরওয়া ইবনে আসাসা (রা.), আবু কায়েস ইবনুল হারিসও (রা.) এ সফরে তার সঙ্গী ছিলেন। চীনে যাবার পথে তারা বাংলাদেশের বন্দর বিশেষত চট্টগ্রাম ও সিলেট নোঙ্গর করেছেন এবং তাদের সান্নিধ্যে এসে এদেশের কিছু সংখ্যক মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। এখান থেকেই বাংলাদেশ ইসলামের যাত্রা।
বিশ্বনবী (সঃ) এর সময়েই সাহাবায়ে কেরামের মাধ্যমে ইসলামের দা‘ওয়াত বাংলাদেশে পৌঁছেছিল । তার প্রমাণ স্বরূপ ‘মুস্তাদরাকে হাকেম’ হাদীছ গ্রন্থে (৪/১৩৫ পৃঃ) সংকলিত বর্ণনা মতে- বাংলার শাসক রাহমী বংশের রাজা শেষ নবীর আগমনের সংবাদে খুশী হয়ে আরব বণিকগণের মাধ্যমে রাসূল (সঃ)-এর দরবারে এক কলসি আসা উপঢৌকন হিসাবে পাঠিয়েছিলেন । রাসূল (সঃ) তা সনন্দে গ্রহন করতঃ নিজে খেয়েছিলেন ও তা টুকরো করে সাহাবায়ে কেরামের মাঝে বন্টন করে দিয়েছিলেন
প্রাক ইসলামি যুগেই আরব বণিকরা সমুদ্র পথে আবিসিনিয়া ও চীন পর্যন্ত তাদের বাণিজ্যিক কার্যক্রম সম্প্রসারিত করেন। আরব-চীনের মধ্যে তাদের কয়েকটিঘাঁটিও ছিলো। এ পথে তাদের প্রথম ঘাঁটি ছিলো মালাবর। তারা নিয়মিত মালাবরের উপর দিয়ে চট্টগ্রাম, সিলেট ও কামরূপ হয়ে চীনে আসা যাওয়া করতেন। এভাবেই চট্টগ্রাম ও সিলেট তাদের যাতায়াতের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হত। মূলত এ সূত্র ধরেই নাম নাজানা আরো বহু সাহাবী দক্ষিণ এশিয়ার বিস্তির্ণ উপকূলবর্তী অঞ্চলগুলোতে ইসলাম প্রচারে কাজ করেছেন। চীনের ক্যন্টনসমুদ্র তীরবর্তী হজরত আবু ওয়াক্কাসের (রা.) মাজার আজও সেই সাক্ষ্য বহন করে আছে। সমুদ্র তীরের কোয়াংটা মসজিদও তিনিই নির্মাণ করেন বলে ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত।
(চীনের ক্যন্টন সমুদ্র তীরে হজরত আবু ওয়াক্কাসের (রা.) মাজার। ছবি: সংগৃহীত)
১২০১ খ্রিস্টাব্দে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির নেতৃত্বে এই ভূখণ্ডে ইসলাম রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এই বিষয়ে ঐতিহাসিকরা একমত হলেও এই ভূখণ্ডে মুসলমানদের প্রথম আগমন কবে ঘটেছিলো বা মুসলিম সভ্যতা এখানে কবে গড়ে উঠেছিলো সে বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত পাওয়া যায়। এই ভিন্ন মতের কারণ হলো, প্রত্নতত্ত্ববিজ্ঞান উন্নততর হওয়ার সাথে সাথে প্রতিনিয়ত মুসলমানদের প্রাচীনতর প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনসমূহ নতুনভাবে খুঁজে পাওয়া যায়। ফলে এই ভূখণ্ডে মুসলমানদের প্রথম আগমনের ব্যাপারে আগের মতবাদগুলো পুরনো হয়ে তার বদলে নতুন মতবাদ এসে যোগ হয়।বাংলাদেশে
ইসলাম আগমনের সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য পথ হচ্ছে চট্টগ্রামের নৌবাণিজ্য পথটি। এ পথ দিয়েই আগমন ঘটেছিল অষ্টম থেকে দশম শতকের সুফি ধর্মপ্রচারকদের। চট্টগ্রামে বায়েজিদ বোস্তামি (মৃত্যু ৮৭৪ খ্রিস্টাব্দ), বগুড়ার মহাস্থানগড়ে সুলতান মাহি সওয়ার (আগমনকাল ১০৪৭ খ্রিস্টাব্দ) এবং নেত্রকোনায় মুহাম্মদ সুলতান রুমি (আগমনকাল ১০৫৩ খ্রিস্টাব্দ) প্রমুখও এই পথেই বাংলাদেশেএসেছিলেন।
আরব বণিকদের এ পথে যাতায়াত ও ভিনদেশি সুফিদের আগমনের ফলে এই বিশাল বাংলার চট্টগ্রামে প্রথম মুসলিম সভ্যতা গড়ে ওঠার যে ইতিহাস আমরা জানি সেটাকে নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করেছে তিন দশক আগে আবিষ্কৃত লালমনিরহাটে অবস্থিত ৬৯ হিজরি সনে (৬৯১ খ্রিস্টাব্দ) নির্মিত ‘হারানো মসজিদ
’টি। যে মসজিদটি ইতিহাস জানল রোমান ও আরব বণিকদের নৌ বাণিজ্যপথ হিসেবে ব্যবহৃত ব্রহ্মপুত্র অববাহিকা সম্পর্কে আমাদের পূর্বের জানাশোনায় এক নতুন মাত্রা যোগ হবে।
(হারানো মসজিদের নতুন অবকাঠামো; Source: The Daily Star)
১৯৮৬ সালের দিকে আশ্চর্যজনকভাবে লালমনিরহাটে পাওয়া যায় খুব প্রাচীন একটি মসজিদ
। এই ভূখণ্ডে মুসলমানদের আগমনের প্রারম্ভিক ইতিহাসের এ যেন রাজসাক্ষী। বিশেষজ্ঞদের আগের সমস্ত মতামতকে তুড়ি দিয়ে উড়িয়ে নতুনভাবে এই মসজিদটি প্রমাণ করলো এ ভূখণ্ডে মুসলিমদের আগমন আজকালকার ঘটনা নয়। অন্তত সাড়ে তেরশ বছর আগের। ৬৯ হিজরি সনে নির্মিত এই মসজিদটির অনতি দূরে তিস্তা নদীর অবস্থান। প্রাচীন মেসোপটেমীয় সভ্যতার দজলা ও ফোরাতের মতো ব্রহ্মপুত্র-তিস্তা অববাহিকাকে পৃথিবীর প্রাচীনতম অববাহিকাগুলোর একটি গণ্য করা হয়। কাজেই এই অববাহিকায় অদূরেই ৬৯ হিজরি তথা ৬৯১ খ্রিস্টাব্দে একটি মসজিদ নির্মাণের ঘটনা অস্বাভাবিক কিছু নয়।
উত্তরাঞ্চলের জেলা লালমনিরহাটের পঞ্চগ্রাম ইউনিয়নের রামদাস গ্রামের একটি আড়ার মাঝে এই হারানো মসজিদটি আবিষ্কৃত হয়। আড়াটি স্থানীয় লোকদের কাছে পরিচিত ছিলো মোস্তের আড়া বা মজদের আড়া নামে। স্থানীয় লোকজন হিংস্র জীবজন্তু, সাপ-বিচ্ছু ইত্যাদির ভয়ে অনেকদিন ধরে পতিত এই আড়াটির ভিতরে প্রবেশ করে না। এখানে মসজিদ, মন্দিরবা অন্য কিছু আছে কিনা কেউ কিছুই অনুমান করতে পারেনি। ১৯৮৩-৮৪ সালে স্থানীয়রা আড়াটি চাষাবাদের জন্য পরিষ্কার করার উদ্যোগ নেয়। ঝোপঝাড় পরিষ্কার করতে গিয়ে তারা দেখে জায়গাটি সমতল জমি থেকে উঁচু এবং সেখানে রয়েছে প্রায় সাত-আটটির মতো মাটির উঁচু টিলা। জায়গাটি সমতল করার জন্য খোঁড়া শুরু হলে সেখনে প্রাচীনকালের তৈরি প্রচুর ইট পাওয়া যেতে থাকে। ইটগুলোর গায়ে ছিলো ফুল আঁকানো। স্থানীয় লোকজন তখন ধারণা করেছেন, পুরনো কোনো জমিদার বা রাজার বাড়ি হয়তো এখানে ছিল। এ কারণে তারা এ নিয়ে কোনো রকম বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেনি। যে যার মতো পেরেছে ভাঙা ইটের টুকরো নিয়ে নিজেদের বাড়িঘরের কাজে লাগিয়েছে। তবে একদিনের ঘটনায় পাল্টে যায় পুরো প্রেক্ষাপট। দিনটি ছিলো ১৯৮৬ সালের ১০ই মহররম। সেদিন গ্রামের আইয়ুব আলী নামের এক ব্যক্তি অন্য অনেকের মতো ইটের স্তুপ থেকে ইট কুড়িয়ে বাড়িতে নিয়ে দেখেন ইটের উপর কিছু একটা লেখা। লেখা স্পষ্ট দেখার জন্য টিউবওয়েলের পানিতে ভালোমতো ধুয়ে নেন। ইট থেকে ময়লা পরিষ্কার হওয়ার পর দেখতে পান ঐ ইটটি একটি প্রাচীন শিলালিপি। ওপরে স্পষ্টাক্ষরে লেখা, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ হিজরি সন ৬৯‘।
(ফুল আঁকা ইট এবং (৬’’×৬’’×২’’) শিলালিপিটি ষ্পষ্টাক্ষারে আরবীতে লেখা আছে ‘লা-ইলাহা-ইল্লাল্লাহু মুহাম্মদুর রাসুলুল্লাহ, হিজরী সন ৬৯ Source : The Daily Star)
এরপর স্থানীয় লোকদের মনে অকাট্য বিশ্বাস জন্মে, এটা কোনো হারানো মসজিদের
ধ্বংসাবশেষ। দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে পূর্বের চেয়ে আরো সতর্ক ও যত্নবান হয়ে মসজিদটির উদ্ধার কাজ চালিয়ে মসজিদের মেহরাব, মসজিদ সংলগ্ন ঈদগাহ, খুৎবা দেয়ার মিম্বার আবিষ্কার করেন। তারপর থেকে সেখানকার লোকজন মসজিদের আঙিনায় টিন দিয়ে সাদামাটা একটি মসজিদ নির্মাণ করে সালাত আদায় করে আসছেন। স্থানীয়রা মসজিদটির নাম দিয়েছেন ‘হারানো মসজিদ’।
গ্রামের বর্তমানের বাসিন্দাদের পূর্বপুরুষরা ২০০ বছর আগে এখানে বসতি শুরু করেছিলেন। একসময় এই পতিত জায়গাটির মালিক ছিলো ‘পচা দালাল’ নামের এক ব্যক্তি। আনুমানিক ১৯৪৯ সালে ইয়াকুব আলী নামের এক ব্যক্তি তার কাছ থেকে এই জায়গাটি কিনে নিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে উত্তরাধিকারসূত্রে জায়গাটির মালিক হন নবাব আলী এবং তার মালিকানাধীন অবস্থায়ই মসজিদটি আবিষ্কৃত হয়েছে। পরে তিনি জায়গাটি হারানো মসজিদ কমপ্লেক্সের নামে দিয়ে দেন।আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিশৌখিন ব্রিটিশ প্রত্নতাত্ত্বিক টিম স্টিল তখন বাংলাদেশের
‘টাইগার ট্যুরিজম’ নামের একটি পর্যটন উন্নয়ন বিষয়ক প্রতিষ্ঠানের উপদেষ্টা হিসাবে কর্তব্যরত ছিলেন। তিনি মসজিদটির আবিষ্কারের কথা শুনে লালমনিরহাট ছুটে গেলেন। বাংলাদেশ ও উপমহাদেশের প্রাচীন ইতিহাস তন্ন তন্ন করে খুঁজতে শুরু করলেন। ৬৯১ খ্রিস্টাব্দে কে বা কেন লালমনিরহাটে এই মসজিদটি নির্মাণ করল তা খুঁজতে নেমে গেলেন তিনি। যোগাযোগ করলেন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তরের সঙ্গে। তারা আগ্রহ দেখাল না। বেশিরভাগ প্রত্নতাত্ত্বিক ও ইতিহাসবিদ বললেন,দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে প্রাচীন মসজিদটি বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের রামদাস গ্রামটিতে অবস্থান করছে তা প্রমাণ করতে টিম স্টিল সহায়তা নেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্নতাত্ত্বিকদের সবচেয়ে প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান ‘আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব আর্কিওলজিস্ট’ এর। সেখানকার ইসলামের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন নিয়ে গবেষকরা জানান- “মসজিদটি সেই সময়ের নির্মিত মসজিদহতে কোনো অসুবিধা নেই।” মসজিদটি নিয়ে টিম স্টিলের ভিডিও প্রতিবেদনটি দেওয়া হলো।
দলিল-প্রমাণ বিশেষ কোনো জাতির প্রত্নতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ বা সেই জাতির অতীত, বর্তমান; তদুপরি সার্বিক অবস্থা নিরূপণের জন্য যে উৎসগুলো প্রয়োজন তা হলো মুদ্রা, শিলালিপি, ঐতিহাসিক সাহিত্য, স্মৃতিসৌধ, রাজকীয় দলিলপত্র, ভিনদেশী পর্যটকদের বিবরণ ইত্যাদি। টিম স্টিল অনেকগুলো প্রমাণ উল্লেখ করেছেন, সেগুলো হলো-‘হারানো মসজিদ
টি’
প্রথমত যে প্রমাণের ভিত্তিতে ৬৯১ খ্রিস্টাব্দের নির্মিত মসজিদ হিসাবে বলা হচ্ছে সেটি হলো মসজিদটির শিলালিপিটি, যেখানে স্পষ্ট করে হিজরি সন ৬৯ লেখা আছে। শিলালিপিটি এখন আছে তাজহাট জমিদার বাড়ি জাদুঘরে।
দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্নতাত্ত্বিকদের সবচেয়ে প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান ‘আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব আর্কিওলজিস্ট‘ এর মতে, রোমান ও জার্মান ইতিহাসবিদদের লেখায় আরব ও রোমান বণিকদের ব্রহ্মপুত্র অববাহিকাকে বাণিজ্যিক পথ হিসাবে ব্যবহারের কথা লিপিবদ্ধ আছে এবং বেশ কয়েকটি চলমান গবেষণায় ব্রহ্মপুত্র-তিস্তা অববাহিকাকে পৃথিবীর সবচেয়ে পুরনো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নৌপথ হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার প্রমাণও পাওয়া গেছে।
তৃতীয়ত, চীনের বিস্মৃত কোয়াংটা নদীর ধারে কোয়াংটা শহরে মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সা) এর একজন সাহাবী আবু ওয়াক্কাছ (রা) নির্মিত মসজিদ
রয়েছে। ব্রিটিশ প্রত্নতাত্ত্বিক টিম স্টিল দাবি করেন, খ্রিস্টপূর্ব সময় থেকে ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তার পাড় ধরে সিকিম হয়ে চীনের মধ্য দিয়ে আরব ও রোমান বণিকদের বাণিজ্য বহরের যাতায়াতের অনেক প্রমাণ রয়েছে তার কাছে। এই হারানো মসজিদটি হতে পারে সাহাবী আবু ওয়াক্কাছ (রা) নির্মাণ করেছেন। কারণ তিনি এই অঞ্চল দিয়েই চীনে পাড়ি জমিয়েছিলেন।
রংপুুরের টাউন হলে ১৯৯৩ সালে একটি সেমিনারের আয়োজন করা হয়, যার বিষয়বস্তু ছিল ‘হিজরি প্রথম শতাব্দীতে ইসলাম ও বাংলাদেশ
’। এতে সভাপতিত্ব করেন কারমাইকেল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুল কুদ্দুস বিশ্বাস। সেদিন প্রবন্ধকার ও সব আলোচক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে প্রমাণ করতে সক্ষম হন যে, ৬৯ হিজরি অর্থাৎ ৬৯১ খ্রিস্টাব্দে সাহাবায়ে কেরামগণ কর্তৃক এই হারানো মসজিদ নির্মাণ করা মোটেই অসম্ভব নয়।চতুর্থত, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান কর্তৃক আবিষ্কৃত নরসংদী থেকে কিশোরগঞ্জ পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে প্রাচীন নগর সভ্যতা অর্থাৎ উয়ারি-বটেশ্বর সভ্যতা, প্রত্নতাত্ত্বিক অধ্যাপক শাহনেওয়াজ কর্তৃক আবিষ্কৃত পঞ্চগড়ের ভিটাগড়ে প্রাচীন নগরের নিদর্শন এবং সর্বোপরি, বগুড়ার মহাস্থানগড় বা নওগাঁর প্রাচীন মসজিদ নিয়ে গবেষণায় যে নিদর্শন পাওয়া গেছে তাতে এটা ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়ে উঠে এসেছে যে, দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে প্রাচীন সভ্যতা বাংলাদেশের ভূখণ্ডে গড়ে উঠেছিল। মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সা) ইন্তেকালের পঞ্চাশ বছরের মধ্যেই এই ভূখণ্ডে মুসলিম সভ্যতা গড়ে উঠেছিলো। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, এ ধরনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন অবহেলায় হারিয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। কখনও কখনও অর্থের লোভে দেশীয় অনেক মূল্যবান প্রত্নসম্পদ বহির্বিশ্বে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে বলেও জানায় আল জাজিরার একটি প্রতিবেদন। এই ধরনেরর মূল্যবান নিদর্শন বেচাকেনা হয় ইন্টারনেটে। এমন বেশ কিছু ওয়েবসাইট ঘেঁটে দেখা গেছে যে, মিউজিয়ামের অনেক প্রত্নসম্পদ, যেগুলো ইন্টারনেটে বিক্রি করা হয়েছে তাদের প্রাপ্তিস্থান বাংলাদেশ। বাংলাদেশেরসংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে এ বিষয়ে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও সফল হতে পারেননি আল জাজিরার প্রতিনিধি। আল জাজিরার ভয়েস প্রতিবেদনটি দেখতে পারেন।
ইসলাম প্রচারের এ ধারা আব্বাসী খেলাফতকালে আরও জোরদারহয়। রাজশাহীর পাহাড়পুরে বৌদ্ধবিহার খননকালে দুটি আরবীমুদ্রা পাওয়া যায়। এই মুদ্রা দুটি তৈরী হয়েছিল ৭৮৮ খৃস্টাব্দে অর্থাৎ আব্বাসী খলীফা হারুনুর রশীদের আমলে।ইতিহাসবিদ ড.এনামুল হকের মতে, কোন ইসলাম প্রচারক এই মুদ্রাগুলো বহন করেছিলেন। পাহাড়পুরে আসার পর বৌদ্ধদের হাতে তিনি শহীদ হন। কুমিল্লা জেলার ময়নামতিতে খননকালে আব্বাসী যুগের আরও দু’টি স্বর্ণমুদ্র পাওয়া যায়। এসব মুদ্রা এ কথাই প্রমাণ করে, খৃস্টীয় অষ্টম-নবম শতকে এদেশে আরব মুসলমানদের মাধ্যমে ইসলামের চর্চা ও প্রচারের কাজ চালুছিল।
এদিকে অষ্টম হিজরিতে ক্যান্টন থেকে চীনের রাজা তাইশাং হজরত আবু কাবশার রা. মারফত ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়ও সাহাবায়ে কেরাম ইসলামের দাওয়াত নিয়ে এসেছিলেন। গুজরাটের রাজা ভোজের কাছে সাহাবায়ে কেরাম এসেছিলেন। ক্যারালার রাজা চেরুমল-পেরুমলও সাহাবাদের হাতে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, একথা ঐতিহাসিক ভাবে প্রমাণিত। কাজেই সেদিক থেকে বিচার করলে ৬৯ হিজরিতে বাংলাদেশে ইসলামের প্রসার শুরু হওয়া বিচিত্র ঘটনা নয়। এই নিদর্শন পাওয়ার পূর্বে ধারণা করা হতো, শুধুমাত্র বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলেই প্রাচীনকালে আরবদের আগমন ঘটেছিল এবং তা খুব বেশি অতীত হলে খ্রিস্টিয় অষ্টম বা নবম শতকে।
বিচ্ছিন্নভাবে
৬৯ হিজরির আগেও বাংলাদেশে ইসলাম আগমনের প্রমাণ পাওয়া যায়। ৬১৭ খ্রি. ১৪
রজব বৃহস্পতিবার প্রিয়নবী সা. আঙুলের ইশারায় চাঁদ দু’ভাগ হতে দেখে
‘রাজাভোজ’ মুসলমান হয়ে আবদুল্লাহ নাম ধারণ করেন এবং তিনিই ভারতীয় সর্বপ্রথম
মুসলমান। এতে বোঝা যায় প্রিয়নবী সা. জীবদ্দশায় উপমহাদেশে ইসলাম প্রচার
শুরু হয়। অন্যদিকে বিবি খাদিজার রা. বাণিজ্যিক জাহাজ চট্টগ্রামে নোঙর
ফেলেছিল এবং দক্ষিণ আরবের ‘সাবা’ জাতি ঢাকার অদূরে বসতি গড়লে তার নাম হয়ে
যায় সাভার। ঠিক তখন থেকেই বাংলাদেশে আরবদের আগমন শুরু হয় এবং তাদের
মাধ্যমেই ইসলামের সূচনা হয়। তবে তখন ব্যাপকভাবে ইসলাম প্রচার হয়নি।
পরবর্তীতে ১২০৩-০৪ খ্রিস্টাব্দে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির
বাংলা বিজয়ের পর থেকেই ব্যাপকভাবে ইসলামের প্রচার ও প্রসার আরম্ভ হয়।
ইসলাম প্রচারের কাজে এদেশে প্রচুরসংখ্যক আরব, ইরানি ও তুর্কি মুসলমান ও
সুফি দরবেশের আবির্ভাব ঘটে। তাঁরা ব্যাপকভাবে এদেশে বসতি স্থাপন করেন।
তাদের বংশ বৃদ্ধির মাধ্যমেই পরবর্তীকালে বাংলাদেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়।
সুতরাং এ কথা পরিষ্কারভাবে বলা যায় যে, এদেশের মুসলমানরা সবাই তফসিলি
হিন্দু বংশধর নয়। হিন্দুদের মধ্য থেকে যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, তাদেরও
অনেকইে ছিলেন রাজ পরিবারের সদস্য। অন্যদিকে, আরবরা এদেশে এসেছেন ব্যবসায়ী
হিসেবে আর সে সময় ব্যবসায়ী অর্থাৎ সওদাগররা ছিলেন সমাজের শ্রেষ্ঠ সম্মানিত
ব্যক্তি। মানব জাতির জন্য মহান আল্লাহর দেয়া পূর্ণাঙ্গ ও সর্বজনীন জীবন
বিধান হিসেবে বিশ্বের সব দেশে ইসলামের প্রচার ও প্রসার হওয়াটা স্বাভাবিক,
অবশ্য এটা নিশ্চিত বলা যায় যে, আরব মুসলমানদের মাধ্যমেই সর্বপ্রথম এদেশে
ইসলামের আবির্ভাব হয়েছে এবং পরবর্তীকালে আউলিয়ায়ে কেরাম ও সুফিয়ানে ইজামদের
মাধ্যমে বাংলাদেশে ইসলামের প্রচার ও প্রসার হয়েছে।
ড.
গোলাম সাকলায়েন লিখিত ‘বাংলাদেশের সূফী-সাধক’ গ্রন্থের ১২৯-১৩০ পৃষ্ঠায়
চট্টগ্রামের ‘বারো আউলিয়ার’ মধ্যে দশ জনের তালিকা দেওয়া হয়েছে। তারা হলেন-
১. হজরত সুলতান বায়েজিদ বোস্তামি (রহ.)।
২. হজরত শেখ ফরিদ (রহ.)।
৩. হজরত বদর শাহ্ বা বদর আউলিয়া বা পীর বদর (রহ.)।
৪. হজরত কতল পীর (পীর কতল) (রহ.)।
৫. হজরত শাহ্ মহসিন আউলিয়া (রহ.)।
৬. হজরত শাহ্ পীর (রহ.)।
৭. হজরত শাহ্ উমর (রহ.)।
৮. হজরত শাহ্ বাদল (রহ.)।
৯. হজরত শাহ্ চাঁদ আউলিয়া (রহ.)।
১০. হজরত শাহ্ জায়েদ (রহ.)।
উল্লেখিত ইসলাম প্রচারকদের সবাই কিন্তু মূল চট্টগ্রামে ইসলাম প্রচারের কাজ করেননি। তারা চট্টগ্রামের আশেপাশে ইসলাম প্রচারে মনোনিবেশ করেন। আনুসাঙ্গিক তথ্যাদিবলে এ কথা অনুমিত হয় যে, এসব আউলিয়া একসঙ্গে চট্টগ্রামে আসেন নি। সম্ভবত তাঁরা দুই-তিনজন এক সঙ্গে অথবা পৃথক পৃথক ভাবে চট্টগ্রামে এসেছিলেন। চট্টগ্রামবাসী এখনও দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে, পীর বদর শাহ, কতল পীর এবং মহসিন আউলিয়া সম্ভবত সর্বপ্রথম একসঙ্গে চট্টগ্রাম অঞ্চলে আগমন করেন। এ জনশ্রুতির সত্যতা সম্পর্কে অনুসন্ধান করেও তেমন কিছু জানা যায়নি।
শাহ জালাল (রঃ) সিলেটে ইসলাম প্রচারের কাজে মনোনিবেশ করেন এবং সেখানে খান্কা প্রতিষ্ঠিত করে জনসাধারণের মাঝে ইসলামের বাণী প্রচার করতে থাকেন। তাঁর শিষ্যগণ সিলেটসহ পার্শবর্তী অঞ্চল, ঢাকা, ময়মনসিংহ, নোয়াখালী, রংপুর, চট্টগ্রাম, ত্রিপুরা ও আসাম প্রদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ইসলাম প্রচার করেন। অন্যান্য ধর্মে শ্রেণীভেদ ও বৈষম্যতার শিকার হয়ে, অনেক ক্ষেত্রে ঐক্য এবং নিরাপত্তা জনিত উদারতার ফলে অনেকেই ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়ে আশ্রয় গ্রহণ করে।
এদেশে যে সমস্ত সুফিদরবেশ ও আলিম উলেমা প্রচার কার্য চালিয়ে ছিলেন, তাঁদের মধ্য গৌড়ের শয়খ আঁখি সিরাজ-উদ-দীন (মৃত্যু ১৩৫৭ খ্রি ), পান্ডুয়ার শয়খ আলাউল হক (মৃত্যু ১৩৯৮ খ্রি ) ও শয়খ নূর কুতুব-ই-আলম (মৃত্যু ১৪১৬ খ্রি), হুগলির ফুরফুরার শাহ আনোয়ার কুলি হলভি (মৃত্যু ১৩৭৫ খ্রি), রংপুরে শাহ ইসমাইল গাজি (মৃত্যু ১৪৭৪ খ্রি), খুলনার খান জাহান আলী (মৃত্যু ১৪৫৮), সোনারগাঁয়ের হাজি বাবা সালিহ (মৃত্যু ১৫০৬ খ্রি.), চট্টগ্রামের শাহ মহসিন আউলিয়া (মৃত্যু ১৩৯৭ খ্রি), ত্রিপুরার রাস্তি শাহ্ (মৃত্যু ১৩৫১ থেকে ১৩৮৮ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে), গৌড়ের মৌলানা বরখুরদার (মৃত্যু ১৪৮৬ খ্রিস্টাব্দের পূর্বে), দেবকোটের মৌলানা আতা সহিদউদদীন ( মৃত্যু ১৩৫৫ খ্রি), রাজশাহীর মৌলানা শাহদৌলা (জীবিত ১৫১৯ খ্রিস্টাব্দে), মুরশিদাবাদের শাহ চাঁদ দাদাগীর (১৪৯৩-১৫১৯ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে মৃত্যু), সপ্তগ্রামের সৈয়দ আমুলি (মৃত্যু ১৫৩১ খ্রি.) প্রমুখ সুফিদরবেশ ও আলিম উলেমাই প্রধান। এমনি করেই স্বাধীন সুলতানি অমলে সারা বাংলাদেশ সুফি, দরবেশ ও আলিমদের ইসলাম ধর্মের প্রচার তৎপরতায় মুখর হয়েউঠেছিল। মুঘল আমলে (১৫৭৬-১৭৫৭ খ্রি) বাংলাদেশে উত্তর ভারত থেকে বহু কলন্দর, দরবেশ ও আউলিয়া আখ্যাধারী সুফি সাধকের আগমন ঘটে।
নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সম্মানিত সাহাবি, তাবেইন, তাবেতাইন, পীর মাশায়েখ সূফি দরবেশ গণ দ্বীনের ডাকে আপন ভূমি থেকে দেশ-দেশান্তরে ছড়িয়ে পড়েছিলেন। ইসলামের পথে ঘরবাড়ি ছেড়ে নিজেদের উৎসর্গ করেছিলেন। তারা অনেকেই এদেশে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তাদের মধ্যে খুব অল্প লোকই সস্ত্রীক আগমন করেছিলেন। এসব বহিরাগত মুসলমানদের অনেকেই এদেশে স্ত্রী গ্রহণ করেন এবং এসব স্ত্রীর গর্ভে বহু সন্তান সন্ততিও জন্মগ্রহণ করে। ফলে বাংলাদেশে মুসলমান সমাজের পরিধি দিনের পর দিন সম্প্রসারিত হতে থাকে এবং বহিরাগত মুসলমানদের আচার ব্যবহার, ধর্ম কর্ম, কথা বার্তা ও জীবন যাপন পদ্ধতি এদেশীয় মুসলমান ও অমুসলমানদের কাছে একটি আদর্শে পরিণত হয়। এভাবে বাংলাদেশে একটি সুষ্ঠু মুসলমান সমাজ-সংস্কৃতির বিস্তার ঘটে এবং একটি স্থায়ী ইসলামী পরিবেশ বা আবহের সৃষ্টি হয়।
সূত্রঃ
-তোফায়েল গাজালি। পরিচালক, আল কোরআন ইনস্টিটিউট, ঢাকা। দৈনিক যুগান্তর। ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২০।
-উইকিপিডিয়া
-আ. খা. মো. আবদুর রব, সাবেক বিভাগীয় প্রধান, বাংলা বিভাগ, সরকারি বিএম কলেজ, বরিশাল।
1 Comments
test
ReplyDelete