স্পেন জয় করার মত শক্তি উসমানীয়দের ছিল না। স্পেনের শাসন ক্ষমতায় থাকা হাফসবার্গরা তখন ছিল ইউরোপের বুকে ছিল একটা বিরাট শক্তি। আর আমেরিকার ইনকা আজটেক এম্পায়ার থেকে লুট করে আনা টনকে টন স্বর্ণ রূপা তাদের সামর্থ্যকে ব্যাপক বাড়িয়ে দেয়।

সবচেয়ে বড় সমস্যা হল স্পেন অটোমানদের রাজধানী থেকে দূরে - বহুদূরে। তারপরও আক্রমণ করতে গেলে দরকার ছিল মরক্কো দখলে থাকা, যে পথে তারিক বিন জিয়াদ ভঙ্গুর ভিসিগোথিক স্পেন আক্রমণ করেছিলেন। কিন্তু মরোক্কোর কুরাইশ বংশীয় সাদী সুলতানরা অটোমানদের কর্তৃত্ব মেনে নেয় নি,উল্টো পর্তুগীজদের সাথে নিয়ে কোনো কোনো সময় অটোমানদের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করেছে। সাদীরা সুন্নী এবং সেই সাথে শক্তিশালী হওয়ায় অটোমানরা তাদের সাথে খুব একটা রক্তপাতে যায় নি……

স্পেনের মুসলিমদের পতনের সময় অটোমানরা কোনো সাহায্য করে নি। - এটা আপনি সম্পূর্ণ ভুল কথা বলেছেন।

গ্রানাডার যখন পতন হয়, মানে ১৪৯২ সালে, তখন অটোমান সাম্রাজ্য কেবল আনাতোলিয়া আর রুমেলিয়ায় সীমাবদ্ধ ছিল। আন্দালুসীয়দের সাহায্য করার মূল দায়িত্ব কাধে বর্তায় কাছাকাছি থাকা তৎকালীন মরক্কোর সুলতানদের আর মিশরের মামলুকদের। কিন্তু তারা তেমন কিছু করে নি। অটোমানরা যা করেছে তার কিছু অংশ আমি 'সানজাক -ই- উসমান ' বইয়ের লেখক প্রিন্স মোহাম্মদ সজল ভাইয়ের ফেসবুক পোস্ট থেকে কপি করে দিচ্ছি।


এপ্রিল,১৪৯৯ সাল।

শেষ রাত।

আলমেরিয়া বন্দর থেকে কয়েক মাইল দুরে নির্জন উপকূলের কাছে চুপচাপ বসে আছে কিছু মানুষ।

গায়ে ছেড়া-ফাটা জামাকাপড়,সাথে সামান্য কিছু আসবাব।

চেহারায় নির্যাতনের ছাপ।

এরা মরিসকো।

মুখে খ্রিস্টান,ভেতরটা মুসলমান।

ইনকুইজিশানের নির্যাতন থেকে সমস্ত সম্পদের বিনিময়ে রেহাই পেয়ে উপকূলে অপেক্ষা করছে,কখন আসবে তুর্কী জাহাজ।

সারা রাত ওরা এখানে অপেক্ষা করে,প্রায় প্রতিদিনই।

জাহাজ আসে না।বরং মাঝে মাঝে খ্রিস্টান জাহাজের মহড়া দেখে হতাশার পরিমানটা আরও বাড়ে।

এই দেশ ওরা ছাড়তে চায়।এই মাটি আর ওদের নেই।

¥¥¥

কামাল রইস সুলতান বায়েজীদের চিঠি পেয়ে রওনা হয়ে গেলেন পশ্চিমে।

কিছুদিন আগেই তিনি নাইটস হসপিটালারদের ওপর ভয়ানক এক হামলা চালিয়ে এজিয়ান সাগরে তাদের জাহাজের আনাগোনা কমিয়ে দিয়েছেন।

নাইটরা হাজীদের মক্কাগামী জাহাজ লুট করেছিল।হাজীরা সুলতানের কাছে অভিযোগ করায় তিনি কামাল রইসকে অভিযানে পাঠান,কামাল তিন মাস ধরে অভিযান চালিয়ে নাইটদের প্রতিটি দ্বীপে গোলাবর্ষন করে তাদের জানিয়ে দেন,হজযাত্রীদের ওপর হামলা হলে তুর্কীদের হাত থেকে তাদের নিস্তার নেই।

¥¥¥

স্পেন অভিযান কামাল রইসের কাছে নতুন কিছু না।১৪৮৭ সাল থেকেই তিনি স্পেনে হামলা চালিয়ে আসছেন।

১৪৮৭ সালে মালাগার ওপর যখন খ্রিস্টানরা হামলা চালায় তিনি তখন উপকূল থেকে গোলাবর্ষন করে তাদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করেন।তিন সপ্তাহ মালাগা দখল করে রেখেছিল তুর্কীবাহিনী,কিন্তু লজিস্টিক সাপ্লাইয়ের অভাব ও সুলতানের মামলুকদের বিরুদ্ধে অভিযানের কারনে তাকে পিছু হটতে হয়।

১৪৯৯ সালের বসন্তে হতভাগ্য মরিসকো মুসলমানরা রাতের পর রাত উপকুলে কাটাতো,হয়তো কোন একদিন তাদের উদ্ধার করতে হাজির হবে কোন মুসলিম জাহাজ।

এক রাতে হঠাৎ হিলালী নিশান লাগানো এক এক হাজার আটশো টনের দানবকে স্পেনের উপকুলে দেখা গেল।

দানবীয় জাহাজটার নাম ছিল গোকে।কামাল রইসের নিশানবাহী জাহাজ।

একে একে উপকুলে নামলো এক ডজন যুদ্ধজাহাজ।

মরিসকোদের সাথে আগে থেকেই তুর্কী স্কাউটরা যোগাযোগ করেছিল,তারা নিখুতভাবে আয়ত্তে নিয়েছিল উপকূলের প্রতিটি ইন্ঞির হদিস।

এক ডজন জাহাজে তুলে নেয়া হল পাচ হাজার মরিসকোকে।

গোটা বসন্তকালে প্রায় এক লাখ মুসলমানকে স্পেনের উপকুল থেকে তুলে নিল তুর্কী জাহাজ।

তাদের ঘাটাবার মত সাহস স্প্যানিশদের ছিল না,এমনকি স্পেনের উপকূলেও না।

শেষ পর্যন্ত স্প্যানিশ কাউন্টার অ্যাটাক এল।

তখনকার মত পিছু হটলেন কামাল।কারন তিনি জানতেন,পেছনে তিনি শত্রু রেখে এসেছেন।ভেনিস।

পেছনে শত্রু রেখে সামনে লড়াই করা বুদ্ধিমানের কাজ না।

¥¥¥

১৪৯৯ সালের অগাস্টে সুলতানের আরেকটা চিঠি পেয়ে আইওনিয়ান উপসাগরের দিকে রওনা হলেন কামাল।ভেনিস খুব যন্ত্রনা দিচ্ছে।যে মুসলিমদের তিনি পশ্চিম থেকে জাহাজে তুলে দিচ্ছেন তাদের ওপরেই হামলা চালাচ্ছে ভেনীশিয়ানরা।

আইওনিয়ান উপসাগরে দাউদ পাশার পাঠানো বিশাল এক ফ্লীট কামাল রইসের জন্য অপেক্ষা করছিল।

তার মোট জাহাজের সংখ্যা দাড়ালো দুই শো,এর মধ্যে বড় গ্যালি আছে কুড়িটা,কারাক আছে দুইটা,একটা কারাক হল কামাল রইসের গোকে,অন্যটা বুরাক রইসের।দুটোরই ধারনক্ষমতা প্রায় ১৮০০ টন,তাদের এই দুটো জাহাজের সাথে প্রতিটা গ্যালিও বহন করছে কামান।

১২ই অগাস্ট তাদের মুখোমুখি হল অ্যান্টোনিও গ্রিমানি,আন্দ্রে লোরদান আর জিয়ানলুইজি পোলানির একশো জাহাজের ফ্লীট।

ভেনিশীয়ান নেভী,গত পাচশো বছরের ভেতর এরাই ছিল ভুমধ্যসাগরের সেরা নৌবাহিনী।

১২,১৫,২০ ই অগাস্ট তিনদিন তিন দফা সংঘর্ষের পর,২৫শে অগাস্ট চুড়ান্ত লড়াই শুরু হল।

এটা ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম নৌ যুদ্ধ যেখানে উভয়পক্ষ জাহাজের ওপর কামান ব্যবহার করে।

তুর্কী কামানের রেন্জ ছিল ভেনিশীয়ানদের চাইতে বেশি,কিন্তু তাতে খুব একটা লাভ হচ্ছিল না।

সাগরের ভেতর ইচ্ছে মত এদিক এদিক সরে গিয়ে গোলা এড়িয়ে যাচ্ছিল ভেনিসের জাহাজগুলো।

তুর্কী কামানের হাত থেকে রেহাই পেলেও তুর্কী তীরন্দাজদের হাত থেকে কোনভাবেই পার পাচ্ছিল না ভেনিশীয়ানরা।

উরই মধ্যে তাদের সাথে যোগ দিল বিশাল চারটি ফ্রেন্ঞ যুদ্ধজাহাজ।

এবার যুদ্ধের মোড় ঘুরে গেল।

একে একে কুড়িটা তুর্কী জাহাজে আগুন ধরে গেল উজ্জীবিত খ্রিস্টান জাহাজগুলোরহামলায়।

বুরাক আর কামাল বেপরোয়া হয়ে উঠলেন।

লোরদান আর পোলানির জাহাজ দুটো ছিল ভেনিসের শক্তির সবচাইতে বড় উৎস।বুরাক তার জাহাজ নিয়ে সোজা ভেনিশীয়ান রাইট উইংয়ের মাঝ বরাবর ঢুকে যেতে লাগলেন।

লোরদান আর পোলানি দুঃসাহসিক এক হামলায় তাদের দুজনের জাহাজ বুরাকের জাহাজের সাথে এক ভয়ানক সংঘর্ষে লিপ্ত হল।লোরদান আর পোলানির জাহাজের র্যাম বিধে গেল বুরাকের জাহাজের ভেতর।

বুরাক ঠাণ্ডা মাথায় একটা হিসেব কষলেন।

তার জাহাজে সাতশো যোদ্ধা আছে,আর লোরদান-পোলানির দুই জাহাজে আছে বারোশো।

তিনটা জাহাজ একসাথে বিধে আছে,এই দুটো জাহাজের কোন ক্ষতি করা তার দ্বারা আর সম্ভব না।

তিনি নিজের বেশিরভাগ সৈনিককে অন্য জাহাজে উঠে যেতে বললেন।

তারপর বিসমিল্লাহ বলে নিজের জাহাজের গানপাউডার স্টোরে আগুন লাগিয়ে দিলেন।

প্রচণ্ড বিস্ফোরনে উড়ে গেল তিনটি জাহাজ।শহীদ হলেন বুরাক রইস,লোরদান আর পোলানি দুজনেই হলেন নিহত।

তুর্কীদের দুঃসাহস দেখে ভয়ে পালিয়ে গেল ফ্রেন্ঞ জাহাজ।

সেরা দুই খ্রিস্টান জাহাজ ডুবে যাওয়ায় রীতিমত স্তম্ভিত হয়ে গেল বাকিরা,কামালের গোকে তখন ভয়ংকর হয়ে উঠলো।তার ভারী আর্টিলারীর গোলাবর্ষনে তছনছ হয়ে গেল ভেনিসের ফ্লীট।

লেপান্তোর প্রথম যুদ্ধে কামাল রইস বিজয় ছিনিয়ে আনলেন,বুরাক রইস আর আরও তিন হাজার বীর যোদ্ধার জীবনের দামে।

¥¥¥

পরের বছর আবারও লড়াই বাধলো আইওনিয়ান উপসাগরে।

এফার আরও আটঘাট বেধে আসলেন কামাল রইস,সাথে যোগ দিলেন ভাতিজা পীর ই রইস,গোটা শীতকালে তারা তাদের ক্ষতিগর্রস্ত জাহাজগুলো মেরামত করেছেন,তাদের জাহাজ ঠিক করার জন্য সুলতান পাঠিয়েছিলেন পনেরো হাজার কারিগর।

অগাস্ট থেকে নভেম্বর ঝাক ঝাক গোলা মেরে কামাল রইস কাপিয়ে তুললেন ইতালীর পূর্ব উপকূল।

লেপান্তো দুর্গ জয় করে নিল তুর্কী বাহিনী,ভেনিস হারাল তার দুই চোখ,কোরন আর মোডন।এই দুটো শহর হারিয়ে

ভেনিস বাধ্য হল সুলতানের বশ্যতা স্বীকার করতে।

এবার কামাল সামনের দিকে তাকালেন,পশ্চিমে।

মুহাজির মুসলিমরা তার পথ চেয়ে বসে আছে স্পেনের উপকূলে।

¥¥¥

১৫০১ সাল থেকে ১৫১০ সালের মধ্যে কামাল ভেসে বেড়িয়েছেন আটলান্টিকের পূর্ব উপকূল,ভুমধ্যসাগরের পশ্চিম,পূর্ব ও উত্তর উপকূলে।

স্পেন থেকে বার বার অভিযান চালিয়ে বের করে এনেছেন পাচ লাখ মুসলিমকে।তাদের সবাইকে কম বেশি জমি দেয়া হয়েছিল গ্রীস,বুলগেরিয়া আর তুরস্কে।যুবকদের অনেককেই ভর্তি করে নেয়া হয়েছিল তুর্কী সেনাবাহিনীতে।

তাকে ঠেকাতে বারবার চেষ্টা করেছে স্প্যানিশ আর পর্তুগীজ নৌবাহিনী,কিন্ত কামাল ছিলেন যেমন বিপজ্জনক,তেমনই আনপ্রেডিক্টেবল।

স্পেনের পশ্চিম উপকূল,আলফাজরা,জিব্রাল্টার,ভ্যালেন্সিয়া,মালাগা,মায়োর্কা,ইবিজা,আলমেরিয়া আর বার্সেলোনায় তিনি বারবার অভিযান চালিয়েছেন।

বালিয়েরিক দ্বীপ,কর্সিকা,সার্ডিনিয়া,সিসিলি,গোজো,ভুমধ্যসাগরের পূর্ব থেকে পশ্চিমে টানা অভিযান চালিয়ে গেছেন সারাটা জীবন,উদ্দেশ্য ছিল একটাই,স্পেনের মুহাজিরদের হিজরতে সাহায্য করা।

তার হাতে যেসব খ্রিস্টানরা বন্দী হত বেশিরভাগকেই স্পেনের সাথে বিনিময় করা হত,মুসলিমদের বিনিময়ে।

ভুমধ্যসাগরে উসমানী নৌবাহিনীর স্বর্নযুগের সুচনার পেছনে যে তিনজন আনসাঙ হিরো ছিলেন,তাদের তৃতীয়জন ছিলেন এই কামাল রইস।

১৫১০ সালের শীতে সমুদ্র থেকে গাল্লিপলিতে ফেরার পথে প্রচণ্ড ঝড়ের মুখে পড়ে হারিয়ে যান কামাল রইস, তার চিরচেনা সমুদ্রের বুকে।