শুধুই কি নিন্দা মহান আল্লাহ তাআ'লা সবচেয়ে বেশি রাগান্বিত হন তার সাথে কোনো কিছুকে শরিক করলে। যেখানে আল্লাহ তাআ'লার দিকে ফিরে আসতে হলে প্রথমেই আপনাকে আল্লাহ তাআ'লার একত্ববাদের সাক্ষ্য দিতে হবে।

"আশহাদু আল লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা-শারীকালাহু ওয়াশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আ'বদুহু ওয়া রাসূলুহু।

"আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবূদ (উপাস্য) নেই। তিনি এক, অদ্বিতীয় এবং আমি আরও সাক্ষ্য প্রদান করছি যে, মুহাম্মাদ (ﷺ) আল্লাহর বান্দা ও প্রেরিত রাসূল।’’

আল্লাহ তাআ'লার কাছে সবরকম পাপ থেকে ক্ষমা চাইলে

আল্লাহ তাআ'লা ক্ষমা করবেন, না চাইলেও করতে পারেন, কিন্তু আল্লাহর সাথে শিরক করাকে তওবা ব্যাতিত ক্ষমা করবেন না, শিরক হচ্ছে সবচেয়ে বড় জুলুম।

আপনি যদি সূরা ইখলাস অর্থ, নামকরণ, শানে নুযূল, পটভূমি ও বিষয়বস্তু পড়েন তাহলে এর সব উত্তর পেয়ে যাবেন ইনশাআল্লাহ

﴿بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ﴾

১) বলো, তিনি আল্লাহ, একক৷
﴿اللَّهُ الصَّمَدُ﴾

২) আল্লাহ কারোর ওপর নির্ভরশীল নন এবং সবাই তাঁর ওপর নির্ভরশীল ৷
﴿لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ﴾

৩) তাঁর কোন সন্তান নেই এবং তিনি কারোর সন্তান নন৷
﴿وَلَمْ يَكُن لَّهُ كُفُوًا أَحَدٌ﴾

৪) এবং তাঁর সমতুল্য কেউ নেই৷

নামকরণ

ইখলাস শুধু এ সূরাটির নামই নয় ,এখানে আলোচ্য বিষয়বস্তুর শিরোনামও । কারণ , এখানে খালেস তথা নির্ভেজাল তাওহীদের আলোচনা করা হয়েছে। কুরআন মজীদের অন্যান্য সূরার ক্ষেত্রে সাধারণত সেখানে ব্যবহৃত কোন শব্দের মাধ্যমে তার নামকরণ করতে দেখা গেছে। কিন্তু এ সূরাটিতে ইখলাস শব্দ কোথাও ব্যবহৃত হয়নি। কাজেই এর এ নামকরণ করা হয়েছে এর অর্থের ভিত্তিতে। যে ব্যক্তি এ সূরাটির বক্তব্য অনুধাবন করে এর শিক্ষার প্রতি ঈমান আনবে , সে শিরক থেকে মুক্তি লাভ করে খালেস তাওহীদের আলোকে নিজেকে উদ্ভাসিত করবে।

নাযিলের সময়- কাল

এর মক্কী ও মাদানী হবার ব্যাপারে মতভেদ আছে। এ সূরাটি নাযিল হবার কারণ হিসেবে যেসব হাদীস উল্লেখিত হয়েছে সেগুলোর ভিত্তিতেই এ মতভেদ দেখা দিয়েছে। নীচে পর্যায়ক্রমে সেগুলো উল্লেখ করছি :

(১) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) বর্ণনা করেন , কুরাইশরা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলে , আপনার রবের বংশ পরিচয় * আমাদের জানান। একথায় এ সূরাটি নাযিল হয়। ( তাবারানী) ।

(২) আবুল আলীয়াহ হযরত উবাই ইবনে কাবের (রা) বরাত দিয়ে বর্ণনা করেন , মুশরিকরা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলে , আপনার রবের বংশ পরিচয় আমাদের জানান। এর জবাবে আল্লাহ এ সূরাটি নাযিল করেন । ( মুসনাদে আহমাদ , ইবনে আবী হাতেম , ইবনে জারীর , তিরমিযী , বুখারী ফিত তারীখ , ইবনুল মুনযির , হাকেম ও বায়হাকী ) এ বিষয়বস্তু সম্বলিত একটি হাদীস আবুল আলীয়ার মাধ্যমে ইমাম তিরমিযী উদ্ধৃত করেছেন। সেখানে হযরত উবাই ইবনে কা’বের বরাত নেই। ইমাম তিরমিযী একে অপেক্ষকৃত বেশী নির্ভুল বলেছেন।

* আরববাসীদের নিয়ম ছিল , কোন অপরিচিত ব্যক্তির পরিচয় লাভ করতে হলে তারা বলতো , ( আরবী -) ( এর বংশধারা আমাদের জানাও ) কারণ তাদের কাছে পরিচিতির জন্য সর্বপ্রথম প্রয়োজন হতো বংশধারার। সে কোন বংশের লোক ? কোন গোত্রের সাথে সম্পর্কিত ? একথা জানার প্রয়োজন হতো । কাজেই তারা যখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে তাঁর রব সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হলো তিনি কে এবং কেমন , তখন তারা তাঁকে একই প্রশ্ন করলো। তারা প্রশ্ন করলো , ( আরবী ————) অর্থাৎ আপনার রবের নসবনামা ( বংশধারা ) আমাদের জানান।

(৩) হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা) বর্ণনা করেন , এক গ্রামীণ আরব ( কোন কোন হাদীস অনুযায়ী লোকেরা ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলে , আপনার রবের বংশধারা আমাদের জানান। এর জবাবে আল্লাহ এ সূরাটি নাযিল করেন ( আবু ইয়ালা , ইবনে জারীর , ইবনুল মুনযির , তাবারানী ফিল আওসাত , বায়হাকী ও আবু নু’আইম ফিল হিলইয়া )

(৪) ইকরামা হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে রেওয়ায়াত করেন , ইহুদীদের একটি দল রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে হাযির হয়। তাদের মধ্যে ছিল কা’ব ইবনে আশরাফ ও হুই ইবনে আখতাব প্রমুখ লোকেরা । তারা বলে , “ হে মুহাম্মাদ ! ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ) আপনার যে রব আপনাকে পাঠিয়েছেন তিনি কেমন সে সম্পর্কে আমাদের জানান। ” এর জবাবে মহান আল্লাহ এ সূরাটি নাযিল করেন। ( ইবনে আবী হতেম , ইবনে আদী , বায়হাকী ফিল আসমায়ে ওয়াস সিফাত )

এ ছাড়াও ইমাম ইবনে তাইমিয়া কয়েকটি হাদীস তাঁর সূরা ইখলাসের তাফসীরে বর্ণনা করেছেন। সেগুলো হচ্ছে :

(৫) হযরত আনাস (রা) বর্ণনা করেন , খয়বারের কয়েকজন ইহুদী রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে বলে , “ হে আবুল কাসেম ! আল্লাহ ফেরেশতাদেরকে নূরের পরদা থেকে , আদমকে পচাগলা মাটির পিণ্ড থেকে , ইবলিসকে আগুনের শিখা থেকে , আসমানকে ধোঁয়া থেকে এবং পৃথিবীকে পানির ফেনা থেকে তৈরি করেছেন । এখন আপনার রব সম্বন্ধে আমাদের জানান ( অর্থাৎ তিনি কোন বস্তু থেকে সৃষ্ট ? ) ” রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একথার কোন জবাব দেননি। তারপর জিব্রীল ( আ) আসেন। তিনি বলেন , হে মুহাম্মাদ ! ওদেরকে বলে দাও , “ হুওয়াল্লাহু আহাদ ” ( তিনি আল্লাহ এক ও একক ) ——————–

(৬) আমের ইবনুত তোফায়েল রসূলুল্লাহকে (সা) বলেন : হে মুহাম্মাদ ! আপনি আমাদের কোন জিনিসের দিকে আহবান জানাচ্ছেন ? তিনি জবাব দেন , “ আল্লাহর দিকে ।” আমের বলে : “ ভালো , তাহলে তার অবস্থা আমাকে জানান। তিনি সোনার তৈরি , না রূপার অথবা লোহার? ” একথার জবাবে এ সূরাটি নাযিল হয়।

(৭) যাহহাক , কাতাদাহ ও মুকাতেল বলেন , ইহুদীদের কিছু আলেম রসূলুল্লাহ (সা) কাছে আসে। তারা বলে : “ হে মুহাম্মাদ ! আপনার রবের অবস্থা আমাদের জানান। হয়তো আমরা আপনার ওপর ঈমান আনতে পারবো। আল্লাহ তাঁর গুণাবলী তাওরাতে নাযিল করেছেন। আপনি বলুন , তিনি কোন বস্তু দিয়ে তৈরি ? কোন গোত্রভুক্ত ? সোনা , তামা পিতল , লোহা , রূপা , কিসের তৈরি ? তিনি পানাহর করেন কি না ? তিনি উত্তরাধিকারী সূত্রে কার কাছ থেকে পৃথিবীর মালিকানা লাভ করেছেন ? এবং তারপর কে এর উত্তরাধিকারী হবে ? এর জবাবে আল্লাহ এ সূরাটি নাযিল করেন ।

(৮) ইবনে আব্বাস (রা) বর্ণনা করেন , নাজরানের খৃষ্টানদের সাতজন পাদরী সমন্বয়ে গঠিত একটি প্রদিনিধি দল রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে সাক্ষাত করে ।তারা তাঁকে বলে : “ আমাদের বলুন , আপনার রব কেমন ? তিনি কিসের তৈরি ? ” তিনি বলেন , “ আমার রব কোন জিনিসের তৈরি নন। তিনি সব বস্তু থেকে আলাদা ।” এ ব্যাপারে আল্লাহ এ সূরাটি নাযিল করেন।

বিষয়বস্তু ও মূল বক্তব্য

নাযিল হওয়ার উপলক্ষ সম্পর্কিত যেসব হাদীস ওপরে বর্ণিত হয়েছে সেগুলোর ওপর এক নজর বুলালে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন তাওহীদের দাওয়াত নিয়ে এসেছিলেন তখন দুনিয়ার মানুষের ধর্মীয় চিন্তা – ভাবনা ও ধ্যান – ধারণা কি ছিল তা জানা যায়। মূর্তি পূজারী মুশরিকরা কাঠ , পাথর সোনা, রূপা ইত্যাদি বিভিন্ন জিনিসের তৈরি খোদার কাল্পনিক মূর্তিসমূহের পূজা করতো । সেই মূর্তিগুলোর আকার , আকৃতি ও দেহাবয়ব ছিল। এ দেবদেবীদের রীতিমত বংশধারাও ছিল। কোন দেবী এমন ছিল না যার স্বামী ছিল না। আবার কোন দেবতা এমন ছিল না যার স্ত্রী ছিল না। তাদের খাবার দাবারেরও প্রয়োজন দেখা দিতো । তাদের পূজারীরা তাদের জন্য এসবের ব্যবস্থা করতো। মুশরিকদের একটি বিরাট দল খোদার মানুষের রূপ ধারণ করে আত্মপ্রকাশ করায় বিশ্বাস করতো এবং তারা মনে করতো কিছু মানুষ খোদার অবতার হয়ে থাকে । খৃষ্টানরা এক খোদায় বিশ্বাসী হলেও তাদের খোদার কমপক্ষে একটি পুত্র তো ছিলই এবং পিতা পুত্রের সাথে খোদায়ী সাম্রাজ্য পরিচালনার ব্যাপারে রুহুল কুদুসও ( জিব্রীল) অংশীদার ছিলেন । এমন কি খোদার মাও ছিল এবং শাশুড়ীও । ইহুদীরাও এক খোদাকে মেনে চলার দাবীদার ছিল কিন্তু তাদের খোদাও বস্তুসত্তা ও মরদেহ এবং অন্যান্য মানবিক গুণাবলীর উর্ধে ছিল না। তাদের এ খোদা টহল দিতো , মানুষের আকার ধারণ করে আত্ম প্রকাশ করতো। নিজের কোন বান্দার সাথে কুশতিও লড়তো । তার একটি পুত্রও ( উযাইর ) ছিল। এ ধর্মীয় দলগুলো ছাড়া আরো ছিল মাজূসী – অগ্নি উপাসক ও সাবী -তারকা পূজারী দল। এ অবস্থায় যখন লোকদেরকে এক ও লা- শারীক আল্লাহর আনুগত্য করার দাওয়াত দেয়া হয় তখন তাদের মনে এ প্রশ্ন জাগা নিতান্ত স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল যে , সেই রবটি কেমন , সমস্ত রব ও মাবুদদেরকে বাদ দিয়ে যাকে একমাত্র রব ও মাবুদ হিসেবে মেনে নেবার দাওয়াত দেয়া হচ্ছে ? এটা কুরআনের অলৌকিক প্রকাশভংগীরই কৃতিত্ব। এ সমস্ত প্রশ্নের জবাব মাত্র কয়েকটি শব্দের মাধ্যমে প্রকাশ করে কুরআন মূলত আল্লাহ অস্তিত্বের এমন সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন ধারণা পেশ করে দিয়েছে , যা সব ধরনের মুশরিকী চিন্তা ও ধ্যান -ধারণার মূলোৎপাটন করে এবং আল্লাহর সত্তার সাথে সৃষ্টির গুণাবলীর মধ্য থেকে কোন একটি গুণকেও সংযুক্ত করার কোন অবকাশই রাখেনি।[1]